অ্যান্ড্রয়েড ফোন ফাস্ট করার উপায়: হ্যাং হওয়া থেকে চিরতরে মুক্তির সম্পূর্ণ গাইড

স্মার্টফোন এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদম জুড়ে গেছে। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত ফোন ছাড়া আমাদের এক মুহূর্ত চলে না। নতুন ফোন কেনার পর প্রথম দিকে তেমন কোন সমস্যা থাকে না।  কিন্তু একটা ফোন যখন পুরোনো হতে থাকে, তখন শুরু হয় বিভিন্ন সমস্যা। যেমন  হ্যাং হওয়া, অ্যাপ ওপেন করতে দেরি হওয়া এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ল্যাগ প্রভৃতি।এমন সমস্যায় পড়েননি এমন মানুষ খুব কমই আছেন। এই সমস্যায় পড়ে অনেকেই ইন্টারনেটে অ্যান্ড্রয়েড ফোন ফাস্ট করার উপায় খোঁজেন। আমরা ভাবি ফোন স্লো হয়ে গেছে মানেই বোধহয় প্রসেসর দুর্বল হয়ে গেছে বা নতুন ফোন কেনার সময় এসেছে। কিন্তু সত্যি বলতে, পকেট খালি করে নতুন ফোন কেনার চেয়ে ফোনের ভেতরের কিছু সেটিংসই ফোনকে আবার নতুনের মতো দ্রুত করে তুলতে পারে। আজ আমরা জানবো ফোনের গতি বাড়ানোর উপায় এবং কীভাবে কোনো টাকা খরচ না করেই আপনার পুরোনো ফোনটিকে বিদ্যুতের গতিতে চালাবেন। 

স্মার্টফোনের সমস্যার ধরণের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন উপায়ে একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোনের সমস্যার সমাধান করা যায়। সার্ভিস সেন্টারে না গিয়ে এই টিপস গুলো ফলো করেই আপনার সাধের স্মার্টফোনটিকে আগের মত ফাস্ট করে ফেলুন – 

১. ডেভেলপার অপশনের গোপন ম্যাজিক (Android Developer Options)

বেশিরভাগ সাধারণ ইউজার এই ট্রিকসটি জানেন না, কিন্তু এটি ফোনের স্পিড বাড়াতে সবচেয়ে দ্রুত কাজ করে। আপনার ফোনে যখন আপনি কোনো অ্যাপ ওপেন করেন বা মেন্যুতে যান, তখন ফোন একটি সুন্দর অ্যানিমেশন দেখায়। এই অ্যানিমেশনগুলো দেখতে ভালো লাগলেও এগুলো প্রসেসরের ওপর চাপ ফেলে। তাই Android Developer Options থেকে এটি অফ করা বা কমিয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

কীভাবে করবেন? প্রথমে আপনার ফোনের Settings-এ যান। সেখান থেকে About Phone-এ গিয়ে Build Number অপশনটি খুঁজুন। এই বিল্ড নাম্বারের ওপর পর পর ৭ বার ট্যাপ করুন। দেখবেন স্ক্রিনে লেখা আসবে— “You are now a developer!”।

এখন আবার মেইন সেটিংসে ফিরে গিয়ে Developer Options (এটি System বা Additional Settings-এর ভেতর থাকে) খুঁজে বের করুন। নিচে স্ক্রল করতে থাকলে তিনটি সেটিংস পাবেন:

  • Window animation scale
  • Transition animation scale
  • Animator duration scale

এই তিনটিই সাধারণত 1x দেওয়া থাকে। আপনি এগুলোকে পরিবর্তন করে 0.5x করে দিন। চাইলে একদম অফ করে দিতে পারেন। এটি মূলত ফোন স্লো হওয়ার সমাধান হিসেবে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। এবার হোম বাটনে ক্লিক করে দেখুন, আপনার ফোনটি কতটা বিদ্যুৎ গতিতে রেসপন্স করছে!

২. স্টোরেজ ম্যানেজমেন্ট: ফোনকে প্রাণভরে শ্বাস নিতে দিন

আমাদের ফোনের স্টোরেজ বা মেমরি যদি কানায় কানায় পূর্ণ থাকে, তবে প্রসেসর ডাটা রিড-রাইট করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা পায় না। আপনার ঘরের মেঝে যদি অপ্রয়োজনীয় আসবাবে ঠাসা থাকে, তবে আপনার যেমন হাঁটতে কষ্ট হবে, প্রসেসরের জন্যও কাজ করা ঠিক তেমনই কঠিন হয়ে পড়ে। অ্যান্ড্রয়েড ফোন ফাস্ট করার উপায় গুলোর মধ্যে ফোনের স্টোরেজ খালি রাখা অন্যতম প্রধান শর্ত। সবসময় চেষ্টা করবেন ফোনের অন্তত ২০% স্টোরেজ খালি রাখতে।

Files by Google App
গুগল ফাইলস অ্যাপ ব্যবহার করে ফোনের মেমরি খালি রাখলে প্রসেসরের ওপর চাপ কমে – এআই ছবি

কীভাবে ক্লিয়ার করবেন?

  • বড় ফাইল ডিলিট: জাঙ্ক ফাইল বা বড় ফাইল ডিলিট করার জন্য গুগলের অফিশিয়াল অ্যাপটি ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ। এর নাম ফাইলস বাই গুগল [Files by Google]। এটি এক ক্লিকেই আপনার ফোনের ডুপ্লিকেট ছবি ও অপ্রয়োজনীয় ফাইল খুঁজে দেয়। নিচে দেওয়া অফিশিয়াল লিংক থেকে অ্যাপটি নামিয়ে নিতে পারেন:
    🔗 Download Files by Google from Play Store
  • ক্ষতিকারক ক্যাশ (Cache) ডেটা ডিলিট: ফেসবুক বা ক্রোম ব্রাউজার ব্যবহার করলে প্রচুর টেম্পোরারি ফাইল বা ক্যাশ ডাটা জমা হয়। এগুলো ফোনের জায়গা দখল করে গতি কমিয়ে দেয়। সেটিংসে গিয়ে Apps > Manage Apps থেকে মাঝে মাঝে এই অ্যাপগুলোর ক্যাশ ক্লিয়ার করুন। মনে রাখবেন, ‘Clear Data’ নয় বরং শুধু ‘Clear Cache’ করবেন, যা ফোনের গতি বাড়ানোর উপায় হিসেবে দারুণ কাজ করে।

৩. প্লে-স্টোরের অটো-আপডেট বন্ধ রাখুন

আমরা যখনই ওয়াইফাই লাইনে কানেক্ট হই, গুগল প্লে-স্টোর ব্যাকগ্রাউন্ডে নিজে নিজেই ফোনের অ্যাপগুলো আপডেট করা শুরু করে দেয়। এতে প্রসেসরের ওপর হঠাৎ বিশাল চাপ পড়ে এবং আপনি যদি ওই মুহূর্তে অন্য কোনো কাজ বা গেম খেলতে যান, তবে ফোন মারাত্মকভাবে স্লো করবে।

কীভাবে বন্ধ করবেন? প্রথমে গুগল প্লে-স্টোরে যান এবং আপনার প্রোফাইল আইকনে ক্লিক করে Settings > Network Preferences > Auto-update apps অপশনে যান। এটিকে “Don’t auto-update apps” করে দিন। এতে আপনার অনুমতি ছাড়া ব্যাকগ্রাউন্ডে কোনো অ্যাপ আপডেট হবে না এবং ফোনের মেমরি একদম ফ্রী থাকবে। যখন প্রয়োজন হবে, আপনি নিজেই ম্যানুয়ালি অ্যাপ আপডেট করে নিতে পারবেন।

৪. লাইভ ওয়ালপেপার এবং অতিরিক্ত উইজেট বর্জন করুন

অনেক ব্যবহারকারীই নিজেদের ফোনের হোম স্ক্রিন সুন্দর করার জন্য নানারকম অ্যানিমেটেড বা লাইভ ওয়ালপেপার ব্যবহার করেন। একই সাথে ঘড়ি, আবহাওয়া বা ক্যালেন্ডারের মতো একাধিক উইজেট স্ক্রিনে ঝুলিয়ে রাখেন। দেখতে আকর্ষণীয় হলেও এই জিনিসগুলো ফোনের ব্যাকগ্রাউন্ডে অনবরত প্রসেসর ও র‍্যামকে খাটিয়ে মারে।

স্মার্ট ট্রিক: ফোনের গতি সচল রাখতে সবসময় একটি সাধারণ বা স্টিল (Static) ছবি ওয়ালপেপার হিসেবে ব্যবহার করুন। হোম স্ক্রিন থেকে অপ্রয়োজনীয় সব উইজেট রিমুভ বা ডিলিট করে দিন। আপনার হোম স্ক্রিন যত মিনিমাল বা পরিষ্কার থাকবে, গ্রাফিক্স প্রসেসরের (GPU) ওপর চাপ তত কমবে এবং ফোন ল্যাগ করা বন্ধ হবে।

۵. ব্যাকগ্রাউন্ডে চলা চোরদের ধরুন (RAM অপ্টিমাইজেশন)

RAM Optimization
সঠিকভাবে মেইনটেইন করলে যেকোনো পুরোনো বা স্লো ফোনকেও আবার নতুনের মতো সচল করা যায়এআই ছবি

আপনার ফোনে হয়তো ৪ জিবি বা ৬ জিবি র‍্যাম আছে, কিন্তু আপনি হয়তো জানেন না যে আপনি ফোন ব্যবহার না করলেও ব্যাকগ্রাউন্ডে ২০-৩০টি অ্যাপ অনবরত আপনার ফোনের মেমরি খরচ করছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা বিভিন্ন থার্ড-পার্টি অ্যাপ গোপনে আপনার ফোনের গতি কমিয়ে দেয়। তাই ফোন হ্যাং হলে করণীয় কী, তা জানতে হলে আগে ব্যাকগ্রাউন্ডের অ্যাপ বন্ধ করা শিখতে হবে।

সমাধান:

  • রিসেন্ট অ্যাপস বন্ধ করা: আমরা অনেকেই একসাথে অনেকগুলো অ্যাপ খুলে রাখি এবং কাজ শেষে সেগুলো ক্লোজ করিনা। কাজের শেষে ফোনের রিসেন্ট অ্যাপস বা মাল্টিটাস্কিং মেন্যু থেকে সব অ্যাপ ক্লোজ করে দিন।
  • অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ আনইনস্টল করা: আমরা অনেকসময় কৌতূহল বশত অনেক অ্যাপ ডাউনলোড করি যা পরে আর ব্যবহার করা হয় না। এই ‘বসে থাকা’ অ্যাপগুলো ফোনকে স্লো করে। তাই অপ্রয়োজনীয় অ্যাপও গুলো আনইন্সটল করে ফোন হালকা রাখুন, স্পিড বাড়বে।

৬. লাইট (Lite) অ্যাপস ব্যবহার করার স্মার্ট অভ্যাস

আপনার ফোনটা যদি একটু পুরোনো হয় বা বাজেট ফোন হয়, তবে ফেসবুক বা মেসেঞ্জারের মেইন অ্যাপ চালানো মানেই ফোনের ওপর পাহাড়সম চাপ দেওয়া। এই অ্যাপগুলো একেকটি ৩০০-৫০০ মেগাবাইট জায়গা নেয় এবং প্রচুর র‍্যাম খরচ করে।

বিকল্প ব্যবস্থা: আপনার যদি ফোনের স্পিড নিয়ে কোনো আপস করতে না চান, তবে সরাসরি প্লে-স্টোর থেকে Facebook Lite, Messenger Lite বা Google Go-এর মতো অ্যাপগুলো ব্যবহার করুন। এগুলো দুর্বল প্রসেসরেও বিদ্যুত গতিতে চলে এবং আপনার ফোনের ব্যাটারিও সেভ করে। এটি ফোন স্লো হওয়ার সমাধান হিসেবে অত্যন্ত প্র্যাক্টিক্যাল একটি পদক্ষেপ।

৭. ধীরগতির মেমরি কার্ড (SD Card) ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন

আমরা অনেকেই ফোনের স্টোরেজ বাড়ানোর জন্য বাজারে এভেইলএবল কমদামি বা নকল মেমরি কার্ড ফোনে ঢুকিয়ে রাখি। এই ক্লাস-৪ বা ক্লাস-৬ এর ধীরগতির মেমরি কার্ডগুলো ফোনের পারফরম্যান্সকে একদম ধ্বংস করে দেয়। যখনই ফোন ওই মেমরি কার্ডের কোনো গান বা ছবি রিড করতে যায়, পুরো সিস্টেম স্লো হয়ে যায়।

করণীয়: যদি মেমরি কার্ড ব্যবহার করতেই হয়, তবে ভালো ব্র্যান্ডের (যেমন Sandisk বা Samsung) অরিজিনাল Class 10 বা UHS-1 গতির মেমরি কার্ড ব্যবহার করুন। আর সম্ভব হলে মেমরি কার্ড ব্যবহার না করে ফোনের ইন্টারনাল স্টোরেজের ওপর ভরসা রাখাই সবচেয়ে উত্তম।

৮. সিস্টেম রিবুট ও নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট

আমরা অনেকেই ্মাসের পর মাস ফোন একটানা চালিয়ে যাই, কখনোই রিস্টার্ট দেই না। একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস হিসেবে ফোনেরও মাঝেমধ্যে বিশ্রামের প্রয়োজন হয়।

কী করবেন? সপ্তাহে অন্তত একবার ফোনটি Restart বা Reboot করুন। এতে ফোনের সিস্টেম গ্লিচগুলো ফিক্সড হয়ে যায় এবং র‍্যাম একদম ফ্রী হয়ে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করে। এছাড়া ফোনের সিস্টেম আপডেট বা সিকিউরিটি প্যাচ আসলে সেগুলো সাথে সাথে আপডেট করে নিন। কারণ অনেক সময় সফটওয়্যারের বাগের (Bug) কারণেও ফোন হ্যাং করে, যা আপডেট করলে ঠিক হয়ে যায়।

৯. শেষ অস্ত্র: ফ্যাক্টরি ডেটা রিসেট (The Master Trick)

যদি উপরের কোনো উপায়ই আপনার ফোনের জন্য কাজ না করে এবং ফোন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে বুঝতে হবে সিস্টেম ফাইলগুলোতে বড় কোনো গড়বড় হয়েছে। অনেক সময় ওএস (OS) ক্র্যাশ করার কারণেও এমন হয়, তখন ফোন হ্যাং হলে করণীয় হিসেবে রিসেট দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

সতর্কতা: ফ্যাক্টরি রিসেট দিলে ফোনের সব ছবি, কন্টাক্ট এবং জরুরি ডেটা মুছে যাবে। তাই রিসেট দেওয়ার আগে অবশ্যই আপনার সব ফাইলের ব্যাকআপ (Google Drive বা মেমরি কার্ডে) নিয়ে নেবেন। রিসেট দেওয়ার পর আপনার ফোনটি সফটওয়্যারগতভাবে একদম নতুনের মতো হয়ে যাবে এবং স্পিড আগের মতো ফিরে আসবে।

উপসংহার

একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন কতটা ফাস্ট চলবে তা শুধু এর দামের ওপর নির্ভর করে না, বরং আপনি ফোনটিকে কতটা গুছিয়ে মেইনটেইন করছেন তার ওপরও নির্ভর করে। অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ ডিলিট রাখা, স্টোরেজ খালি রাখা এবং অ্যানিমেশন কমিয়ে রাখার মাধ্যমে ৩-৪ বছরের পুরোনো ফোনকেও অনায়াসে নতুনের মতো ফাস্ট চালানো সম্ভব।

আশা করি আজকের এই অ্যান্ড্রয়েড ফোন ফাস্ট করার উপায় এবং টিপসগুলো আপনাদের কাজে আসবে। ডেভেলপার অপশনের সেই ট্রিকটি অ্যাপ্লাই করার পর আপনার ফোনের স্পিড কতটা বাড়লো? আমাদের কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না! টেক ওয়ার্ল্ডের এমন আরও দরকারি টিপস ও ট্রিক্স নিয়মিত পেতে Taklix-এর সাথেই থাকুন।

Leave a Comment